১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকার শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক প্লাটফর্ম ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ২১টি সংগঠনের উদ্যোগে জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সরকারি প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আন্দোলন কর্মী, গবেষক এবং জলবায়ু-ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ প্রায় ২,০০০ মানুষ অংশগ্রহন করেন। জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশের শুরুতে পায়রা উড়িয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও ঘোষণা দেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। সমাবেশের আগে এক হাজারের বেশি দেশি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু কর্মী একটি র‍্যালিতে অংশ নেন। র‍্যালিটি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে আগারগাঁও হয়ে সম্মেলনস্থলে গিয়ে শেষ হয়। র‍্যালিতে বৈশ্বিক দূষণকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আকতার।  উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সম্মেলনের আহ্বায়ক এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার এবং সঞ্চালনা করেন ধরা এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল। বাংলাদেশ আদিবাসী জনগোষ্ঠী ফোরাম–এর সাধারণ সম্পাদক ও ধরার সদস্য সঞ্জীব দ্রং স্বাগত বক্তব্য দেন। সমাবেশের জাতীয় সহ–আয়োজকদের মধ্যে ছিল ব্রাইটার্স, ব্রতী, সিপিআরডি, কোস্ট ফাউন্ডেশন, সিআরইএসএল, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, ওএবি ফাউন্ডেশন ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহ আয়োজকদের মধ্যে ছিল এপিএমডিডি, ফসিল ফুয়েল নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ, ফসিল ফ্রি জাপান, এলডিসি ওয়াচসহ বিভিন্ন সংগঠন।

সমাবেশের উদ্বোধনকালে সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস. মুরশিদ বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে কম দায় থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী দেশ। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির ফ্রন্টলাইন দেশগুলোর একটি। অথচ গ্লোবাল নর্থের দেশগুলো পদক্ষেপ নিতে দেরি করায় দরিদ্র দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।” শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আমরা তাদের কাছে ঋণী নই—বরং তারা আমাদের কাছে ঋণী। জলবায়ু ন্যায্যতা এখন জবাবদিহিতা ও কার্যকর পদক্ষেপের বিষয়” ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে আর কেবল প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। “জলবায়ু ন্যায্যতা মানে ন্যায়, টিকে থাকা এবং জবাবদিহিতা।” জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অব্যাহত নির্ভরতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। গ্লোবাল নর্থ প্রায়ই ন্যায়বিচারের বদলে ঋণ দেয়,”। তিনি নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্হাপন করেন এশিয়ান পিপলস মুভমেন্ট অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সমন্বয়ক এবং এশিয়ান এনার্জি নেটওয়ার্কের আহবায়ক লিডি ন্যাকপিল। তিনি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসা এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরও জোরালো বৈশ্বিক সহায়তার আহ্বান জানান। মূল প্রবন্ধের ওপর প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেন ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ (এফওই) যুক্তরাজ্যের প্রধান নির্বাহী আসাদ রেহমান। সমাবেশে সংহতি বক্তব্যে রাখেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আশিস দামলে এবং তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের ডেপুটি রিজিওনাল প্রোগ্রাম ডিরেক্টর কাইনান হাউটন। সমাবেশে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে ধনী দেশগুলোর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড আনু মোহাম্মদ বলেন পূর্ববর্তী ১৫ বছরের শাসনামলে নানা বিপর্যয়ের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জলবায়ু ও পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের নামে ঋণ নেওয়া দেশের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সমাবেশের সহ-আহ্বায়ক এম এস সিদ্দিকী বলেন, ‘রামপাল প্রকল্পসহ যেসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম, আজ তার ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট। তরুণদের সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহভাবে যুক্ত করা জরুরি। মানবাধিকার ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইনি পথেও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে।’

ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ–এর প্রধান নির্বাহী আসাদ রেহমান বলেন, যে সংকট দরিদ্র দেশগুলো সৃষ্টি করেনি, তার অর্থায়নের দায় তাদের ওপর চাপানো অন্যায়। তিনি বলেন, ঋণ ও পরিশোধের মাধ্যমে এখনও গ্লোবাল সাউথ থেকে গ্লোবাল নর্থে অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে দক্ষিণের দেশগুলো প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। এই সংকটের দায় যাদের সবচেয়ে কম, তাদের দিয়ে মূল্য চোকানো শুধু অন্যায় নয়, অশ্লীল। ধনী দেশগুলোকেই এর মূল্য দিতে হবে।

তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন–এর ডেপুটি রিজিওনাল প্রোগ্রাম ডিরেক্টর কাইনান হাউটন বলেন, উন্নয়নের মূল্য হিসেবে দূষণ মেনে নেওয়ার সময় শেষ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি একটি কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক বিকল্প, এবং সৌরশক্তি ও ব্যাটারিনির্ভর শহরগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

ফসিল ফুয়েল নন-প্রলিফারেশন ট্রিটী ইনিশিয়েটিভ এর কৌশলগত উপদেষ্টা হারজিৎ সিং বলেন, জলবায়ু ন্যায্যতা কেবল দেশগুলোর মধ্যকার বিষয় নয়; এটি দেশের ভেতরের বৈষম্য এবং আমরা যে উন্নয়ন মডেল বেছে নিচ্ছি, তার সঙ্গেও জড়িত। এখন সময় এসেছে গ্লোবাল নর্থের ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন পথ প্রত্যাখ্যান করার। তিনি জাতীয়, আঞ্চলিক ও দক্ষিন সহযোগিতা জোরদারের উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে মানুষ ও প্রকৃতিকে কেন্দ্রে রাখার কথা বলেন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি বলেন, চরাঞ্চল, হাওর অঞ্চল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে, যার মধ্যে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা এবং সামগ্রিক জীবন মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে।

ধরা এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন আইইপিএমপি ও এমআইডিআই পরিকল্পনাগুলো বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। এগুলো ব্যয়বহুল আমদানিকৃত কয়লা ও এলএনজি নির্ভরতা বাড়ায়। ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা চাপায়, জনগণকেন্দ্রিক নবায়নযোগ্য জালানীভিত্তিক ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে। বর্তমানে বিদ্যমান বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরী করে অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে যা জনস্বার্থ বিরোধী।

সমাবেশে বক্তারা জলবায়ু সংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে ধনী দেশগুলোর গরিমসির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।   

সমাবেশে উপকূল, হাওর, চর ও বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে আসা জেলে, কৃষক, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, যুব, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীসহ প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি অংশ নেন।  অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বক্তারা নদী দখল, অব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নে অগ্রগতি আনতে কপ–২৯–এর ব্যর্থতার সমালোচনা করেন । তারা দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নীতি সংলাপের ওপর জোর দেন।

সমাবেশ শেষে জলবায়ু ন্যায্যতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনগণের অধিকার বিষয় এর উপর আট দফা ঘোষনাপত্র প্রকাশ করা হয়। ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন ধরিত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সদস্য সচীব শরীফ জামিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে তিনি জানান, ৮ দফা জনগণের এই ঘোষণা সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে। তিনি আশা করেন এটি জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর জ্বালানি পরিকল্পনার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বাংলাদেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক, নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ও জনগণকেন্দ্রিক রূপান্তরের পথ তৈরি করবে। সমাপনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সমাবেশের আহবায়ক ড মজিবুর রহমান হাওলাদার।

Please follow and like us: