গত ২৪ জুন ২০২৫ সকাল ১১টায় ঢাকাস্থ শ্যামলী পার্ক মাঠে বাংলাদেশে কয়লা ও এলএনজিতে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগ বন্ধের দাবীতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও অন্যান্য কর্মসুচী আয়োজন করা হয়। জাপানের বেসরকারি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানসমুহ যেমনঃ MIZUHO, MUFG, SMBC, JERA, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুৎ ও এলএনজি প্রকল্প স্থাপনের জন্য বিশেষভাবে বিনিয়োগ করছে। চলমান জুন মাসে জাপানের বেসরকারী সংস্থা তথা ব্যাংকসমূহ তাদের বিনিয়োগের অনেকগুলো জরুরী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এই বিনিয়োগের বিষয়কে বিবেচনা করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এবং আরও ২১ টি সংগঠন জাপানি সংস্থাসমুহ জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে আহবান জানানোর লক্ষ্যে যৌথভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করেছে। সমাবেশের আয়োজক সংগঠনগুলো হল-ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), বাংলাদেশ ইয়ুথ ক্লাইমেট কোয়ালিশন, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, সেন্টার ফর এ্যাটমোস্ফেরিক পল্যুশন স্ট্যাডিস (ক্যাপস), সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ইকুইটিবিডি, এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইআরডিএ), গ্লোবাল ল’ থিংকারস সোসাইটি (জিএলটিএস), ব্রাইটার্স, মিশন গ্রীন বাংলাদেশ, অর্গানাইজেশন ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট কনজার্ভেনশন (ওসিআরইসি), খাসিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (কেএসইউ), সচেতন ফাউন্ডেশন, সুন্দরবন ও উপকুল সুরক্ষা আন্দোলন, ইয়াং ক্লাইমেট একশন নেটওয়ার্ক (ইউক্যান), থ্রিফিফটিডটঅরগ (350.org), রিভার বাংলা, গর্জন, ওএবি ফাউন্ডেশন, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার, যুব পরিবেশ ও উন্নয়ন সংস্থা ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ।
সমাবেশে আয়োজনের উদ্দেশ্য ও মুল বক্তব্য তুলে ধরেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কয়লা ও গ্যাসে অর্থায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জাপানি প্রতিষ্ঠানসমূহ এগিয়ে যাবার কারণে দেশের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাধীনতা পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপান অন্যতম সহযোগী দেশ। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের জালানি খাতে জাপান কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনাল স্থাপন করার যে পরিকল্পনা জাপানের সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করে চলছে, তা শুধু এ দেশের প্রাণ-প্রকিতির জন্য সর্বনাশ বয়ে আনছে তা নয়, বরং নবায়নযোগ্য জালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশের যে অযুত সম্ভাবনা রয়েছে, তাকেও অংকুরে বিনষ্ট করে আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি করবে। আমরা আশা করি, জাপান বাংলাদেশে জীবাশ্ম জালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা প্রত্যাহার করবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে সহযোগিতা করবে।
সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফিয়ারিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস) এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা প্রয়োজন, কিন্তু কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক জ্বালানি হলে তা হবে আমদানি নির্ভর ও বিপজ্জনক। করোনা সংক্রমণ ও রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের সময়কালে জীবাশ্মজালানি খাতে বিনিয়োগের প্রভাব সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা দেখেছি যে ঢাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। আমাদের দেশে গড় আয়ু হ্রাস পাচ্ছে, রোগের প্রকোপ বাড়ছে এবং আমরা এখন আমাদের চিকিৎসার জন্য আরও বেশি ব্যয় করছি। কাজেই জাপানের প্রতিষ্ঠানসমুকে আমরা দূষক শিল্পায়নে অর্থায়ন বন্ধের দাবি জানাই।
কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এসএম বদরুল আলম বলেন, আমরা জানি যে জাপানের প্রতিষ্ঠানসমূহ এই মাসে তাদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে। অতীতে বাংলাদেশে অনেক ভালো প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে জাপান। কিন্তু সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির প্রধান উৎস হল কয়লা এবং জীবাশ্ম জ্বালানি যা এখনই বন্ধ হওয়া উচিত।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের গবেষনা ও বাস্তবায়ন প্রধান ইকবাল ফারুক বলেন, গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি আমাদের দেশে ট্রানজিশনাল জ্বালানি হিসেবে প্রবেশ করানো হচ্ছে যা ভ্রান্ত সমাধান। গত ১ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানি প্রতিষ্ঠানসমূহ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করছে এবং ইতিমধ্যে তারা অনেক অর্থ আয়ও করেছে। কিন্তু এই অর্থায়ন আমাদের টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সুন্দরবন ও উপকুল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল ও সুন্দরবন ধ্বংস হচ্ছে এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ওইসব এলাকার মানুষ অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে হবে। আমরা আশা করি এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর সহকারি অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন আমরা বিদেশী প্রকল্পের উপর নির্ভরশীল। এগুলো বন্ধ হলে আমরা বিপদগ্রস্ত হই। ফলে আমাদের সামাজিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে আমাদের নিজস্ব প্রকল্প তৈরি করতে হবে।
গ্লোবাল ল থিঙ্কার্স সোসাইটি (জিএলটিএস) এর প্রেসিডেন্ট রাওমান স্মিতা বলেন, আমাদের মিথ্যা সমাধান প্রত্যাখ্যান করতে হবে। অন্যান্য দেশের লোকেরা আমাদেরই কিছু লোকের সহায়তায় আমাদের পরিবেশ এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে। এটি বন্ধ করা উচিত। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত নয় এমন প্রকল্পগুলি বন্ধ করা।
সচেতন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক যে যখন আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে কথা বলছি, তখন জাপান এই প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করছে। কার্বন নির্গমনের উপর কোনও গ্রহণযোগ্য গবেষণা নেই। সেকারনে আমরা বলতে পারব না যে, আমরা কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী নই। আমরা আমাদের ভবিষ্যতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না।
গর্জন এর সাধারন সম্পাদক ফারজানা উর্মি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার জেলে ও লবণ চাষীরা। তাদের জন্য আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে।
সমাবেশে মিশন গ্রিন ভলান্টিয়ার্স পরিবেশন করে ফ্ল্যাশ মব টেলিং স্টোরি, যেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গ্যাস প্রকল্প স্থাপনের প্রভাব এবং সৌর প্যানেল সহ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে তা তুলে ধরা হয়। মিশন গ্রিন বাংলাদেশ কর্তৃক পরিবেশিত একটি পাপেট শোয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।













